শ্রী: শ্রীমতে শঠকোপায় নমঃ শ্রীমতে রামানুজায় নমঃ শ্রীমদ বরবরমুিনয়ে নমঃ


লক্ষ্মীনাথ সমারম্ভাম নাথ যামুন মধ্যমাম।
অস্মদাচার্য পর্যন্তাম বন্দে গুরু পরম্পরাম।।
আমি সেই মহিমান্বিত গুরু পরম্পরার উপাসনা (বন্দনা) করি যা শ্রীমন নারায়ণের মাধ্যমে শুরু হয়েছে, যার মাঝে রয়েছেন নাথমুনি ও যমুনাচার্য এবং যা আমার নিজের আচার্যের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে। আমাদের এই গুরু পরম্পরার মহিমা কীর্তন করার জন্য এই ঐশ্বরিক শ্লোকটি কুরত্ত আল্বান (কুরেশাচার্য ) রচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, ‘অস্মদাচার্য’ বলতে এম্পেরুমানার-কে (রামানুজাচার্য) বোঝায়, কারণ এম্পেরুমানার ছিলেন তাঁর নিজস্ব আচার্য। তবে সাধারণ অর্থে, যিনি এই শ্লোকটি পাঠ করেন, ‘অস্মদাচার্য’ বলতে তাঁর দীক্ষাগুরু বা আচার্যকেই বোঝাবে।

আমাদের সম্প্রদায়ের দর্শনকে ‘এম্পেরুমানার দর্শন’ বলা হয়—যেমনটি নাম্পেরুমাল কর্তৃক স্বীকৃত এবং মনবাল মামুনিগল ( শ্রীমদ্ বরবর মনু স্বামীজি ) তাঁর উপদেশ রত্নমালাই গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। শ্রী রামানুজাচার্যই তাঁর জীবদ্দশায় সনাতন ধর্মকে (চিরন্তন জীবনপথকে) পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি তাঁর পূর্বসূরি শ্রী নাথমুনিগল, শ্রী আলবন্দার (যামুনাচার্য) প্রমুখ আচার্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তত্ত্ব ও উপদেশসমূহকে গ্রহণ করে অত্যন্ত সহজ ও সুস্পষ্ট ভাষায় সর্বসাধারণের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন।
গুরু এবং আচার্য শব্দ দুটি প্রায় সমার্থক। গুরু বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেন।
আচার্য বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি শাস্ত্রসমূহ যথাযথভাবে অধ্যয়ন করেছেন, নিজে সেই শাস্ত্রবিধি অনুসারে জীবনযাপন করেন এবং অন্যদেরও সেই পথে পরিচালিত করেন। গুরু-পরম্পরা বলতে আচার্যদের অবিচ্ছিন্ন উত্তরাধিকার-ধারাকে বোঝায়। আমাদের শ্রীবৈষ্ণব গুরু-পরম্পরা স্বয়ং শ্রীমন্নারায়ণ থেকেই সূচিত হয়েছে, যেমনটি আমরা “লক্ষ্মীনাথ-সমারম্ভাম্” শ্লোকে দেখতে পাই। শ্রীমন্নারায়ণের অসীম ও অপরিমেয় করুণার ফলেই তিনি নিজেই সংসারে আবদ্ধ জীবাত্মাদের (সাংসারিক বন্ধনে আবদ্ধ আত্মাসমূহের) হৃদয়ের অজ্ঞানতা দূর করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যাতে তাঁদের উদ্ধার করে পরমপদে চিরস্থায়ী, আনন্দময় ও কল্যাণকর জীবন প্রদান করতে পারেন। এই কারণেই তিনি আমাদের গুরু-পরম্পরার প্রথম আচার্যরূপে আবির্ভূত হন এবং শাস্ত্রসমূহে নিহিত অমূল্য তত্ত্ব, অর্থ ও রহস্যসমূহ শিক্ষা প্রদান করেন।
“তত্ত্বজ্ঞানান্ মোক্ষলাভঃ”—শাস্ত্র এই ঘোষণাই করে। প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে জীব মোক্ষলাভ করে। বর্তমানে আমাদের যে সমস্ত সত্য ও শুদ্ধ জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছে, তা এই অবিচ্ছিন্ন গুরু-পরম্পরার মাধ্যমেই আমাদের নিকট এসেছে। অতএব, আমাদের আচার্যগণের সম্বন্ধে অধিকতর জানা এবং তাঁদের জীবনচরিত ও উপদেশ সর্বদা আলোচনা করা অত্যন্ত সমীচীন।
শ্রীমহালক্ষ্মীর পতিদেব, পরমেশ্বর শ্রীমান নারায়ণ, যিনি নিত্যকাল শ্রীবৈকুণ্ঠে তাঁর দিব্য মহিষীগণ—শ্রীদেবী, ভূদেবী ও নীলাদেবীর সহিত বিরাজমান এবং যেখানে অনন্ত, গরুড়, বিশ্বক্ষেন প্রভৃতি নিত্যসূরিগণ তাঁহার সেবা করেন, তিনি অসংখ্য কল্যাণগুণে পরিপূর্ণ।
শ্রীবৈকুণ্ঠ (পরমপদ) অনন্ত আনন্দের ধাম। তথাপি সেখানে অবস্থান করেও ভগবানের হৃদয় সংসারে আবদ্ধ জীবাত্মাদের প্রতিই নিবিষ্ট থাকে, কারণ তাঁহারা সংসারের দুঃখভোগে ক্লিষ্ট। সমস্ত জীবাত্মা তিন প্রকার—
১. নিত্য — যাঁহারা সর্বদা পরমপদে অবস্থান করেন এবং কর্মফলের কারণে কখনও সংসারে আবদ্ধ হননি।
২. মুক্ত — যাঁহারা পূর্বে সংসারে আবদ্ধ ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে মুক্তিলাভ করে পরমপদে উপনীত হয়েছেন।
৩. বদ্ধ — যাঁহারা কর্মবন্ধনের ফলে এখনও সংসারে আবদ্ধ রয়েছেন।
এই তিন প্রকার জীবাত্মাই ভগবানের অধীন এবং সকলের সঙ্গেই ভগবানের একই সম্পর্ক বিদ্যমান—বিশেষত স্বামী-দাস ( প্রভু – সেবক ) এবং পিতা-পুত্র সম্পর্ক।
এই চিরন্তন সম্পর্কের কারণেই ভগবান নিরন্তর বদ্ধজীবদের কল্যাণসাধনে রত থাকেন। তিনি অবিরাম তাঁদের শ্রীবৈকুণ্ঠে নিয়ে গিয়ে তাঁর নিত্যসেবায় (কৈঙ্কর্যে) নিয়োজিত করার জন্য অনুগ্রহ করে চলেছেন।
শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, মোক্ষলাভের জন্য জীবের প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। এই প্রকৃত জ্ঞান রহস্যত্রয় (রহস্যত্রয়ম্)-এ সুস্পষ্ট ও সংক্ষিপ্তভাবে উপদেশিত হয়েছে। যে মহাপুরুষ এই মুক্তিদায়ক তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করে জীবাত্মাকে সংসারবন্ধন থেকে মুক্তির পথে পরিচালিত করেন, তাঁকেই আচার্য বলা হয়।
আচার্যপদ এতই গৌরবময় ও মহিমান্বিত যে, স্বয়ং শ্রীমন্নারায়ণও আচার্যের ভূমিকা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করেছেন। সেই কারণেই তিনি সর্বপ্রথম বা প্রথম আচার্য (প্রথমাচার্য) রূপে আবির্ভূত হন।
আমাদের পূর্বাচার্যগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, ভগবান তিনটি স্থানে আচার্যরূপে অবস্থান গ্রহণ করে এই মহান পদকে অলঙ্কৃত করেছেন। সেই তিনটি স্থান হল—
- ভগবান (এম্পেরুমান) বদরিকাশ্রমে নারায়ণ ঋষি (আচার্য)-র রূপ ধারণ করে তাঁরই অবতার নর ঋষি (শিষ্য)-কে তিরুমন্ত্রের উপদেশ প্রদান করেছিলেন।
- ভগবান (এম্পেরুমান) বিষ্ণুলোকে পেরিয় পিরাট্টি (শ্রীদেবী নাচ্চিয়ার)-এর নিকট দ্বয় মহামন্ত্র উপদেশ করেন। এইভাবেই আমাদের শ্রীবৈষ্ণব গুরুপরম্পরার সূচনা হয়।
- ভগবান (এম্পেরুমান) পার্থসারথি (শ্রীকৃষ্ণ) রূপে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে চরম শ্লোক উপদেশ করেছিলেন
৬০০০-পদী গুরুপরম্পরা প্রভাবম্ (পিন্বাঝাগিয় পেরুমাল জিয়ার কর্তৃক রচিত), যতীন্দ্র প্রবণ প্রভাবম্ (পিল্লৈ লোকম্ জিয়ার কর্তৃক রচিত) এবং অন্যান্য পূর্বাচার্য-প্রণীত গ্রন্থে বর্ণিত আমাদের গৌরবময় গুরুপরম্পরা সম্পর্কে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে এটি আমাদের এক বিনীত প্রয়াস।
অডিয়েন্ সপ্তর্ষি রামানুজ দাস
তথ্যসূত্র – https://acharyas.koyil.org/index.php/2012/08/16/introduction-english/
প্রমেয় – https://koyil.org
প্রামাণ্য – http://srivaishnavagranthams.wordpress.com
প্রমথা – https://acharyas.koyil.org
শ্রী বৈষ্ণব শিক্ষা/বাল-বালিকা পোর্টাল – https://pillai.koyil.org