দিব্য দম্পতি 

শ্রী: শ্রীমতে শঠকোপায় নমঃ শ্রীমতে রামানুজায় নমঃ শ্রীমদ বরবরমুিনয়ে নমঃ

গুরু পরম্পরা

পূর্ববর্তী প্রবন্ধে (https://acharyas.koyil.org/index.php/2026/07/12/introduction-2-bangla/) আমরা আমাদের গুরু-পরম্পরা সম্পর্কে আলোচনা আরম্ভ করেছিলাম।

এখন আমরা সম্প্রদায় প্রবর্তক (ওরাণ্-ভাঝি) আচার্য-পরম্পরা নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করব। ওরাণ্-ভাঝি বলতে জ্ঞানের এমন এক ধারাবাহিক প্রেরণ-পদ্ধতিকে বোঝায়, যেখানে একজন থেকে আরেকজনের কাছে ক্রমান্বয়ে ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে জ্ঞান হস্তান্তরিত হয়।

আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞান রহস্যত্রয়ম্ (Rahasya Trayam)-এ নিহিত। আমাদের সম্প্রদায় প্রবর্তক আচার্য-পরম্পরা অত্যন্ত যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই অমূল্য তত্ত্বজ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষণ ও প্রেরণ করে এসেছে।

  • পেরিয় পেরুমাল 

তিরুনক্ষত্রম্: আবণি , রোহিণী

রচনাসমূহ: ভগবদ্ গীতা, শ্রীশৈলেশ-দয়াপাত্রম্ তনিয়ান্ প্রভৃতি। 

আমাদের ওরাণ্-ভাঝি (OrAN vazhi) গুরু-পরম্পরা স্বয়ং পেরিয় পেরুমাল (শ্রীরঙ্গনাথ)-এর মাধ্যমে শুরু হয়। পূর্ববর্তী প্রবন্ধে আমরা দেখেছি যে, অপরিমেয় করুণাবশত ভগবান নিজেই প্রথম আচার্য (প্রথম আচার্যন্)-এর পদ গ্রহণ করেন। তিনি বিষ্ণুলোক (পরমপদ)-এ পেরিয় পিরাট্টি (শ্রীমহালক্ষ্মী)-কে রহস্যত্রয়ম্ উপদেশ করেন।

এম্পেরুমানই একমাত্র স্বতন্ত্র (স্বাধীন) এবং শেষী (প্রভু বা অধিপতি)। অন্য সকলেই পরতন্ত্র (তাঁর উপর নির্ভরশীল) এবং শেষ (তাঁর দাস বা অধীন)। তিনি নিজের ইচ্ছাতেই প্রথম আচার্যের পদ গ্রহণ করেন। তিনি সর্বজ্ঞ (sarvajña), সর্বশক্তিমান (sarvaśakta) এবং সর্বব্যাপী (sarvavyāpi)। তাঁর এই অতুলনীয় ও প্রশ্নাতীত সামর্থ্যই তাঁকে সেই সমস্ত জীবাত্মাদের মোক্ষদান করতে সক্ষম করে, যারা আন্তরিকভাবে মোক্ষ কামনা করে।

পেরিয় পেরুমাল (যাঁর আদি নাম ছিল নারায়ণন) শ্রীরঙ্গ বিমানের সহিত পরমপদ থেকে অবতীর্ণ হয়ে ব্রহ্মার নিকট প্রকাশিত হন এবং সত্যলোকে ব্রহ্মা কর্তৃক আরাধিত হন। পরবর্তীকালে ইক্ষ্বাকুর প্রার্থনায় তিনি অযোধ্যায় আগমন করেন এবং রঘুকুলের রাজাগণ তাঁকে পরম ভক্তিভরে পূজা করেন। শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা বিজয়ের পর বিভীষণকে  উপহারস্বরূপ পেরিয় পেরুমালকে প্রদান করেন। বিভীষণ  যখন তাঁকে নিয়ে লঙ্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন, তখন পথিমধ্যে শ্রীরঙ্গমে পেরিয় পেরুমালকে স্থাপন করেন। শ্রীরঙ্গমের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে— “যেখানে ভ্রমরসমূহ গুঞ্জরণ করে এমন বনরাজি, যেখানে ময়ূরগণ বিচরণ করে এমন বনরাজি, যেখানে মেঘসমূহ নত হয়ে ভেসে বেড়ায় এমন বনরাজি, এবং যেখানে কোকিলসমূহ মধুর স্বরে গান গায় এমন বনরাজি”— ভগবান সেই স্থানেই অবস্থান করার সংকল্প করেন এবং দক্ষিণমুখী হয়ে শ্রীরঙ্গমে চিরস্থায়ীভাবে অধিষ্ঠিত হন।

পেরিয় পেরুমাল তনিয়ণ 

শ্রীস্তনাভরণং তেজঃ শ্রীরঙ্গেশয়মাশ্রয়ে । 
চিন্তামণিমিভোদ্ভান্তমুৎসঙ্গেऽনন্তভোগিনঃ ।। 

  • পেরিয় পিরাট্টি 

তিরুনক্ষত্র: পঙ্গুনি মাস, উত্তরম 

বিষ্ণুলোক (পরমপদ)-এ এম্পেরুমান শ্রী পেরিয় পিরাট্টির নিকট দ্বয় মহামন্ত্র উপদেশ করেন। পেরিয় পিরাট্টি সেই সমস্ত গুণের মূর্ত প্রতীক, যা একজন আচার্যের মধ্যে থাকা আবশ্যক।

একজন আচার্যের মধ্যে কৃপা (সংসার-দুঃখে ক্লিষ্ট জীবদের প্রতি দয়া), পারতন্ত্রিয়ম্ (এম্পেরুমানের প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা) এবং অনন্যার্হত্বম্ (সম্পূর্ণরূপে এম্পেরুমানেরই অধীন ও তাঁরই জন্য নিবেদিত থাকা) — এই তিনটি গুণ থাকা আবশ্যক।

পিরাট্টি এই তিন গুণেরই মূর্ত প্রতীক হওয়ায়, তিনি যথার্থভাবেই আমাদের ওরাণ্-ভাঝি (OrAN vazhi) গুরু-পরম্পরার দ্বিতীয় আচার্যের অলংকারস্বরূপ আসন অধিকার করেছেন। তিনিই সকল পরবর্তী আচার্যদের আচার-আচরণ ও জীবনধারার মূল প্রেরণাস্বরূপ।

পিল্লৈ লোকাচার্য তাঁর শ্রীবচন ভূষণম্-এ ব্যাখ্যা করেছেন যে, সীতা পিরাট্টি রূপে জীবনে যে তিনবার বিচ্ছেদ (বিরহ) তিনি সহ্য করেছিলেন, সেই তিনটি ঘটনায় তিনি এই তিনটি গুণ—কৃপা, পারতন্ত্রিয়ম্ এবং অনন্যার্হত্বম্—সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ ও প্রদর্শন করেছেন।

প্রথমত, যখন রাবণ তাঁকে বলপূর্বক লঙ্কায় অপহরণ করে নিয়ে যায়, তখন তিনি তাঁর পরম কৃপাগুণের কারণেই সেই ঘটনাকে ঘটতে দেন। কারণ, তিনি যদি লঙ্কায় না যেতেন, তবে দেবস্ত্রীগণ (দেবতাদের পত্নীরা) উদ্ধার লাভ করতে পারতেন না। সমগ্র জগতের জননী হওয়ার কারণে রাবণও তাঁর সন্তানতুল্য। সেই মাতৃসুলভ স্নেহ ও মমতার বশেই তিনি রাবণের অসদাচরণ ও দুষ্কর্ম সহ্য করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, যখন তিনি গর্ভবতী অবস্থায় ছিলেন এবং শ্রী রামচন্দ্র তাঁর প্রজাদের সমালোচনার কারণে তাঁকে রাজ্য ত্যাগ করতে বলেছিলেন, তখন তিনি তা সম্পূর্ণরূপে মেনে নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি নিজেকে এম্পেরুমানের প্রতি সম্পূর্ণরূপে পরতন্ত্র (পারতন্ত্রিয়ম্) বলে অনুভব করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে, এম্পেরুমান যা আদেশ করবেন, তিনি তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করবেন। এই ঘটনায় তিনি তাঁর পারতন্ত্রিয়ম্—অর্থাৎ ভগবানের প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা ও আজ্ঞাপালনের গুণ—সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। 

তৃতীয়ত, বনবাস-পরবর্তী জীবনের শেষে যখন তিনি শ্রী রামচন্দ্রকে চিরতরে ত্যাগ করে পরমপদে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তিনি এই সত্য প্রতিষ্ঠা করেন যে তিনি একমাত্র তাঁরই—অন্য কারও নন। এভাবেই তিনি তাঁর অনন্যার্হত্বম্ (ananyārhatvam) প্রকাশ করেন, অর্থাৎ তিনি সম্পূর্ণরূপে শ্রী রামচন্দ্রের জন্যই নিবেদিতা এবং অন্য কারও প্রতি তাঁর কোনো অধিকার বা সম্পর্ক নেই।

অতএব, তিনি একজন আদর্শ আচার্যের জন্য অপরিহার্য এই তিনটি গুণ—কৃপা, পারতন্ত্রিয়ম্ ও অনন্যার্হত্বম্—পরিপূর্ণরূপে ধারণ ও প্রকাশ করেছেন। 

পেরিয় পিরাট্টি তনিয়ণ 

নমঃ  শ্রীরঙ্গনায়ক্যৈ যদভ্রূবিভ্রমভেদতঃ।
ঈশেষিতব্যবৈষম্য নিম্নোন্নতমিদং জগত্ ।। 

পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা সেনাই মুদলিয়ার (বিষ্বকসেন) সম্পর্কে আলোচনা করব।  

অডিয়েন্ সপ্তর্ষি রামানুজ দাস

তথ্যসূত্র – https://acharyas.koyil.org/index.php/2012/08/17/divya-dhampathi-english/

প্রমেয় – https://koyil.org
প্রামাণ্য – http://srivaishnavagranthams.wordpress.com
প্রমথা – https://acharyas.koyil.org
শ্রী বৈষ্ণব শিক্ষা/বাল-বালিকা পোর্টাল – https://pillai.koyil.org